সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতি: নতুন তথ্যে আত্মঘাতী তিন খ্যাতিমান

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতি: নতুন তথ্যে আত্মঘাতী তিন খ্যাতিমান

0 ১২০

মানুষ আত্মহত্যা কেন করে? একজন মানুষের আত্মহত্যার পেছনে নানা কারন থাকতে পারে। পারিবারিক, সামাজিক, মনোস্তাত্ত্বিক ইত্যাদি নানা কারণ নিয়ে সেগুলো বিশ্লেষণ করা যায়। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিশেষ প্রতিভার অনেক ব্যক্তিদের মাঝেও আত্মহত্যার প্রবণতা লক্ষ্যনীয়। যার ফলে দেখা যায় আত্মহননকারী ঐ প্রতিভাবান ব্যক্তিটি ঘিরে তৈরি হয় নানান জল্পনাকল্পনা, তৈরি হয় মিথ। মৃত্যুর বহুকাল পরেও ভক্ত, পাঠক, সমালোচকরা তাঁকে নিয়ে কথা বলেন, আলোচনা করেন। সব সমাজেই আত্মহত্যাকে ঘৃণার চোখে দেখা হয়েছে। এভাবে জীবনের কাছে পরাজয় কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না কখনোই। আত্মহননের মাধ্যমে জীবনের ইতি টানা কোন মানুষের মৃত্যুই গ্রহণযোগ্য নয়। আর মানুষটি যদি বিশেষ প্রতিভা, গুণ বা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হয়, তাহলে তাঁর আত্মহত্যা সমাজের জন্য আরো ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।

এবারের সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতিতে থাকছেন তিন প্রতিভাবান ব্যক্তি যারা আত্মহত্যা করে তাঁর মূল্যবান জীবনের ইতি টেনেছিলেন, কিন্তু মৃত্যুর এত কাল পরে এই ২০১৬ সালেও তারা ফিরে আসছেন নতুন করে নতুনভাবে। যতটা না আত্মহত্যার জন্য তার চেয়ে বেশি তাদের সৃষ্টিশীল কর্মের জন্যই।

ভ্যান গগের কান

Vanভ্যান গগের কান। আরো স্পষ্ট করে বললে ভ্যান গগের বাম কান। সবাই জানে ভ্যান গগ তাঁর বাম কানটি কেটে ফেলেছিল। চরম এ ঘটনাটি ঘটার পর থেকে প্রায় ১২৮ বছর ধরে পন্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক চলছে, এই অঙ্গহানির তীব্রতা কতটুকু ছিল তা নিয়ে। ঘটনাটি ঘটেছিল ১৮৮৮ সালের ডিসেম্বরের ২৩ তারিখ ফ্রান্সের অরলেসে। তিনি কি কানের লতিটুকু কেটেছিলেন? নাকি পুরোটাই?
লেখক ও অপেশাদার ইতিহাসবিদ শ্রীমতি ব্রেনেত মারফি তার একটি নতুন বইয়ের জন্য যখন পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট এই শিল্পীর জীবনের শেষ দিনগুলো নিয়ে গবেষণা করছিলেন তখনই আমেরিকান আর্কাইভে সংরক্ষিত একটি নথি আবিষ্কার করে বসেন যা কিনা ভ্যান গগের কান-বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারে। নথিটি হল ডাক্তার ফেলিক্স রে’এর একটি লিখিত নোট। কান কাটার পর এই চিকিৎসক অরলেস হাসপাতালে ভ্যান গগের চিকিৎসা করেছিলেন। নোটটিতে কর্তন করা কানের একটি ছবিও এঁকেছিলেন ডাক্তার ফেলিক্স রে। এতে দেখা যাচ্ছে ভ্যান গগ প্রকৃতপক্ষে প্রায় সম্পূর্ণ কানটিই কেটে ফেলেছিলেন। কানের লতির কাছে যা একটু মাংস অবশিষ্ট ছিল,ক্ষত শুকাতে শুকাতে তাও প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়।

প্রদর্শনের উদ্দেশে চিঠি এবং নোটটি অ্যামস্টারডামে ভ্যান গগ জাদুঘরে রাখা হয়েছে। প্রদর্শনীর নাম ‘বিচ্ছিন্নতা বোধের শেষপ্রান্তে’। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে শুরু প্রদর্শনীটি চলবে সেপ্টেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত। প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছে বেশ কিছু অপ্রদর্শিত কাগজ,নথি ও আর্টিফেক্টস যা কিনা আরো বিস্তারিতভাবে প্রমাণ করবে ভ্যান গগের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে। আছে শিল্পীর আঁকা ২৫টির মতো চিত্রকর্ম ও ব্যবহার করা কিছু জিনিসের সাথে পুরোনো ক্ষয়ে যাওয়া একটি রিভলবার। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ বলছেন, রিভলবারটি ভ্যান গগ নিজেকে হত্যার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছিলেন।
এসবের মাধ্যমে অনুসন্ধানের চেষ্টা করা হচ্ছে পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট এই শিল্পীর জীবনের চরম দুর্দশাময় শেষ সময়ের অবস্থা সম্পর্কে। কান কেটে ফেলা থেকে শুরু করে ফ্রান্সের অভর-সু- অইসে ১৮৯০ সালের ২৯ জুলাই মাত্র ৩৭ বছর বয়সে যখন তিনি দৃশ্যত আত্মহত্যা করেন।
Van-1ভ্যান গগের মনোজগত ও মানসিক অসুস্থতা সবসময়ই তাঁর ভক্তদের আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিল। বিশেষ করে তাদের কাছে যারা ভ্যান গগের শিল্পকর্মকে শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। কিন্তু এতকাল পর্যন্ত ভ্যান গগ মিউজিয়াম এই বিষয়টাকে কেন্দ্র করে বা শিল্পীর মানসিক অবস্থার সাথে সম্পর্কিত বস্তু সামগ্রীর সংগ্রহ নিয়ে কোন প্রদর্শনীর আয়োজন করেনি কখনো। এতদিন পর্যন্ত জাদুঘরটি ভ্যান গগের শিল্পকর্মের নান্দনিক এবং প্রযুক্তিগত ক্রমবৃদ্ধির উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিল। সুতরাং বলা যায়, এটিই প্রথম প্রদর্শনী যা কিনা এই শিল্পীর জীবনকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করছে। শুধু তাই নয়, এই প্রদর্শনী উপলক্ষে ৫৮ বছর বয়সী ব্রিটিশ আইরিশ গবেষক ও লেখিক শ্রীমতি ব্রেনাতে মারফির একটি বইও প্রকাশিত হয়েছে। বইটির নাম- ভ্যান গগ’স এয়ার- দি ট্রু স্টোরি। যদিও আজ পর্যন্ত হাজার হাজার বই বেরিয়েছে ভ্যান গগ’কে নিয়ে। কিন্তু তাঁর কান নিয়ে এটিই প্রথম। ভ্যান গগের কান নিয়ে আজ পর্যন্ত রহস্য, জল্পনাকল্পনা, লেখালেখি প্রচুর হয়েছে। এখনতো অনেকটা রূপকথা হয়ে গেছে ভ্যান গগের কান। ফলে এই বইটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, চিত্রশিল্পী, দর্শক ও বিশেষজ্ঞদের মনোযোগ কেড়ে নিতে পেরেছে একই সাথে অবশ্যই ভ্যান গগ প্রেমীদেরও।
এই বইয়ের লেখক শ্রীমতি মারফি বাস করেন ভ্যান গগের আবাসস্থল অরলেস থেকে খানিকটা দূরে অন্য আরেকটি প্রদেশে। অনেকদিন ধরেই শনাক্ত করার চেষ্টা করে আসছিলেন সেই নারীটি আসলে কে? কি তাঁর পরিচয় যাকে ভ্যান গগ কান কেটে উপহার দিতে চেয়েছিলেন।
আগেই বলেছি ১৮৮৮ সালে ডিসেম্বরে এই ঘটনা ঘটিয়েছিলেন ভ্যান গগ। মেয়েটির নাম গ্যাব্রিয়েল। কমবয়সী মেয়েটি তখন একটি পতিতালয়ে কাজ করত একজন দাসী হিসেবে। ঐ সময়ে পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যের সূত্র ধরে জানা যায়, ভ্যান গগ নাকি তাঁর কান কেটে নিয়ে মেয়েটিকে বলেছিলেন, “এই জিনিসটি সাবধানে রাখ”, এবং তা দেখে সঙ্গে সঙ্গেই মেয়েটি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল।
ব্যাপারটা এমন যে, ভ্যান গগ তাঁর শরীরের একটি অংশ দিতে চেয়েছিলেন যাতে অসহায় মেয়েটির শরীরের অন্য একটি অংশের নিরাময় হয়। মেয়েটির শরীরে খুব বীভৎস একটি ক্ষত চিহ্ন ছিল। আর এজন্যই ভ্যান গগ তাঁর শরীরের তাজা একটুকুরো মাংস খন্ড দিতে চেয়েছিলেন।

রূপালী পর্দায় সিলভিয়া প্লাথ

Silviaহলিউড অভিনেত্রী কারস্টেন ডানস্ট পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার জন্য বেছে নিলেন সিলভিয়া প্লাথের আত্মজৈবনিক উপন্যাস দি বেলজারকে। অতিসম্প্রতি এই ঘোষণা দিলেন জুমানজি,স্পাইডারম্যান ও মিলানকোলিয়া-খ্যাত সুন্দরী এই অভিনেত্রী। সমসাময়িক অনেক মহান সাহিত্যিক ও তাদের সাহিত্য নিয়ে বড় পর্দায় কাজ হয়েছে অনেক। কিন্তু এসবের মাঝে অকালে ঝরে যাওয়া সিলভিয়া প্লাথ প্রায় অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছেন। যদিও ১৯৭৯ সালে এবং ২০০৩ সালে সিলভিয়ার জীবনী অবলম্বনে হলিউডে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল। কিন্তু সেখানে দি বেলজার-এর লেখক সিলভিয়া অনুপস্থিত। তাঁর সত্যিকারের জীবন আর কাজ সেখানে তুলে ধরা হয়নি। ফলে, কারস্টেন-এর এই ঘোষণা ব্যাপক সাড়া ফেলেছে সিলভিয়া প্লাথ ভক্তদের মাঝে। মরণোত্তর পুলিতজার পুরস্কারজয়ী এই কবি ও ঔপন্যাসিকের মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে আত্মহত্যার মাত্র কয়েকদিন আগে প্রকাশিত হয় দি বেলজার

Plath দি বেলজার গ্রন্থের এসথার গ্রীনউড চরিত্রটি আসলে সিলভিয়া নিজেই,এই প্রধান চরিত্রে অভিনয় করবেন বর্তমানের তরুণ মেধাবী অভিনেত্রী দাকোতা ফেনিং। ২০১৭ সালের জানুয়ারীতে এই ফিচার ফ্লিমের দৃশ্য ধারনের কাজ শুর করবেন কারস্টেন। এখন চলছে চিত্রনাট্য তৈরিসহ প্রি-প্রোডাকশনের কাজ। ইতিমধ্যেই কারস্টেন দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মান করে বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। সারা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে আছে সিলভিয়া প্লাথের ভক্ত-পাঠক। সবাই আশা করছেন কারস্টেন রূপালী পর্দায় সিলভিয়ার জীবনকে তুলে ধরার কাজটি সফলতার সাথেই করতে সক্ষম হবেন। কেননা, সিলভিয়ার জীবনকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা একটু কঠিনই বটে। সিলভিয়া প্লাথের শৈশব, কৈশোর, শিক্ষা ও লেখক জীবন এসব ছাড়াও কবি টেড হিউসের সাথে প্রেম বিয়ে, দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন, বিষণ্ণতা আর অবসাদে ভোগার কারণে আত্মহত্যাকে বেছে নেয়া এসব কিছু পর্দায় ফুটিয়ে তোলার জন্য পরিচালক হিসেবে কারস্টেনকে যে বিশেষ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিতে হবে তা বলাই বাহুল্য। অন্যদিকে সিলভিয়ার মৃত্যু হয়েছিল ১৯৬৩ সালে ইংল্যান্ডে। ফলে সেসময়ের সাথে মিলিয়ে চলচ্চিত্রটির সেট নির্মানের কাজটিও করতে হবে। শুধু তাই নয় কঠিন আরেকটি কারণেও, চলচ্চিত্রটি যদি সিলভিয়া প্লাথের আসল জীবনটিই ধারণ করতে চায় তাহলে, এর শেষ দৃশ্যে দেখা যাবে- রাতের বেলা বেডরুমে ঘুমিয়ে আছে সিলভিয়ার নাবালক দুই শিশু, স্বামী টেড হিউস তখন অন্য কোথাও অন্য কোন নারীর শয্যাসঙ্গী আর সিলভিয়া নিজেকে খুন করার উদ্দেশে মাথা ঢোকাচ্ছেন রান্নাঘরের ওভেনে…