বৃষ্টি উপেক্ষা করে শোলাকিয়া ঈদ জামাতে লাখো মুসল্লি

90

স্টাফ রিপোর্টার,ঢাকা :

 

ভোর থেকে মেঘে মেঘে অন্ধকার আকাশ। সকাল সাড়ে সাতটা থেকে শুরু হয় বৃষ্টি। টানা বৃষ্টিতে শহরের অধিকাংশ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠেও পানি জমে সয়লাব। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মুসল্লিরা এমন বৈরী আবহওয়া উপেক্ষা করেই রওনা দেন শোলাকিয়া ঈদগাহের দিকে। ময়দানের কাঁদাপানির মধ্যেই সকাল ৯টায় লাখো মুসল্লি পলিথিন ও ছাতা মাথায় নামাজের জন্য দাঁড়িয়ে পড়েন ঈদ জামাতে। নামাজের ঠিক আগে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমে আসে।

বুধবার কঠোর নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে দেশের অন্যতম বড় ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয় কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে শোলাকিয়া ঈদ জামাতের ইমাম মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসুদকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি নির্ধারিত সময়ের ২০ মিনিট দেরিতে কিশোরগঞ্জ পৌঁছান। ফলে সকাল ১০টায় জামাতের নির্ধারিত সময় থাকলেও তা শুরু হয় ১০টা ২০ মিনিটে। এজন্য মুসল্লিরা ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকলে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও পৌর মেয়র মাইকে তাদের শান্ত করেন।

সকাল ১০টায় মাঠ কানায়-কানায় ভরে যায়। পরে মুসল্লিরা মাঠের পাশের বিভিন্ন সড়কে নামাজ পড়তে দাঁড়িয়ে যান।

জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী, জেলা পুলিশ সুপার মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ বিপিএম, উপ-সচিব ডিডিএলজি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, পৌর মেয়র মাহমুদ পারভেজ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আবদুল্লাহ আল মাসউদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান, সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. নাজমুল ইসলাম, মাঠ পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহদী হাসানসহ জেলার বিভিন্ন বিভাগের ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত রাজনীতিবিদ, জনপ্রতনিধি, শহরের গন্যমান্য ব্যক্তিরা এ ঈদ জামাতে নামাজ আদায় করেন।

শোলাকিয়ায় ঈদ জামাতে অংশ নিতে গত কয়েকদিন ধরেই নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ, কুমিল্লা, বরিশাল, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, যশোরসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে  কিশোরগঞ্জে আসতে শুরু করে মানুষ। তারা আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের বাসায়, আবাসিক হোটেলে, শহরের মসজিদগুলোতে ও ঈদগাহ মাঠে আশ্রয় নেয়। মাঠে অবস্থান নেওয়া মুসল্লিদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করে কিশোরগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স। সর্বশেষ বুধবার ভোরে ট্রেন, বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, রিকশা, মোটরসাইকেল, সাইকেলে চড়ে ও পায়ে হেঁটে কিশোরগঞ্জে আসে মানুষ।

বাংলাদেশ রেলওয়ে শোলাকিয়ায় ঈদ জামাতের মুসল্লিদের জন্য ‘শোলাকিয়া স্পেশাল এক্সপ্রেস ট্রেন’ নামের দু’টি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করে। ট্রেন দু’টি ভৈরব ও ময়মনসিংহ থেকে সকালে ছেড়ে আসে এবং সকাল পৌনে ৯টায় কিশোরগঞ্জ রেল স্টেশনে পৌঁছায়। দুপুর ১২টায় আগত মুসল্লিদের নিয়ে কিশোরগঞ্জ থেকে ভৈরব ও মযমনসিংহের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় ট্রেন দু’টি।

নারায়ণগঞ্জের মাধবদী থেকে আসা মো. ইলিয়াস (৩২), ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে আসা আফজল হোসেন (৫২),  সিলেটের বিশ্বম্ভুর থেকে আসা ওমর ফারুক (৬২), রংপুর সদর থেকে আসা বশির মিয়ার (৫৫) সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা বলেন, দীর্ঘদিনের ইচ্ছা আল্লাহ আজ কবুল করলেন। নামাজ পড়ে শান্তি পেয়েছি। বড় জামাতের মোনাজাতে শরীক হতে পেরে গোনাহ মাফসহ মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভ করতে পেরেছি বলে বিশ্বাস করি।

বিভিন্ন জেলা থেকে আসা আরও বেশ কয়েকজন মুসল্লির সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেন, একাধিকবার নিয়ত করেছি শোলাকিয়ায় নামাজ পড়ব, আসা হয়নি। আল্লাহতায়ালা এবার মকসুদ পুরা করেছেন। বিশেষ ফরিয়াদে এখান এসেছি। নিশ্চয় আল্লাহ কবুল করবেন।

সিসি ক্যামেরা ও ড্রোন ক্যামেরায় পর্যবেক্ষণ করা হয় শোলাকিয়া ময়দান। বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ, আর্মড পুলিশ, ডিবি ও সাদা পোষাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এ ঈদ জামাতকে কেন্দ্র করে বিশেষ নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টি করে।

রেওয়াজ অনুযায়ী নামাজ শুরুর ১৫ মিনিট আগে পরপর তিনবার শর্টগানের গুলি ছুঁড়ে মুসল্লিদের নামাজে দাঁড়ানোর সংকেত দেওয়া হয়। নামজের পরে বয়ানে মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনাসহ দেশবাসী ও সরকারের জন্য  দোয়া করেন।

তিনি দেশের সব সৎ রাজনীতিবিদের দীর্ঘায়ু কামনা ও মুসলিম উম্মার শান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করেন।

মাঠ কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী জানান,  এ বছর পাঁচ লাখের বেশি  মুসল্লি এ জামাতে নামাজ আদায় করেন। শান্তিপূর্ণভাবে জামাত সম্পন্ন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সবার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে লোক সমাগম বেশি হওযায় শোলাকিয়া মাঠের আয়তন বাড়ানো, সুষ্ঠুপানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাসহ মাঠটি পাকা করার দাবি জানিয়েছেন কিশোরগঞ্জবাসী।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.