বরগুনায় ১৬০টি ঝুঁকিপূর্ণ প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনেই চলছে পাঠদান

3

স্টাফ রির্পোটার, ঢাকা

বরগুনা জেলায় ৭৯৮ টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় এর মধ্যে ১৬০ টি বিদ্যালয়ের ভবন জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এরমধ্যে ১৫ টি বিদ্যালয় পরিত্যক্ত ঘোষনা করা হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা পিলারে বড় বড় ফাটল ধরেছে। এ্রছাড়া ছাদের পলেস্তার খসে পড়েছে, একটু বৃষ্টি হলে ছাদ চুয়ে পানি পড়ে। ফলে এসব বিদ্যালয়ে আতঙ্কের মধ্যেই চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। এসব পরিত্যক্তও ঝুঁকিপূর্ণ স্কুলভবনে এখনো পাঠদান চলছে। বরগুনা জেলার সদর উপজেলায় ২৩০ টির মধ্যে ৫০ টি ঝুকিপূর্ণ ও ১৫টি পরিত্যক্ত। বেতাগী উপজেলায় ১২৭ টি প্রাথমিক মধ্যে ১৯ টি বিদ্যালয় ঝুকিপুর্ণ। বামনা উপজেলায় ৬২ বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬ টি ঝুকিপূর্ণ। পাথরঘাটা উপজেলায় ১৪৯ টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪২ টি বিদ্যালয় ঝুকিপূর্ণ, এর মধ্যে ২০টি বিদ্যালয় অধিক ঝুকিপূর্ণ। আমতলীতে ১৫২ টির মধ্যে ৬টি, তালতলীতে ৭৮ টির মধ্যে ২৮ টি বিদ্যালয় ঝুকিপূর্ণ হয়ে পরছে। এসব বিদ্যালয়ে পাঠদান করানো হয় বলে জানান সংশ্লিষ্ঠ উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তারা। ১৬০টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ক্লাস করছে শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছেন, ভবন নির্মাণে অনিয়ম হওয়ায় ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে ভবনগুলো। আর এ কারণে বারবার দুর্ঘটনায় নিহত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। তবে এ ব্যাপারে শিক্ষা অফিস দায় চাপাচ্ছে এলজিইডির উপর। বরগুনা সদর উপজেলা প্রকৌশলী শওকত হোসেন বলেন, লবণাক্ততা ও আবহাওয়া খারাপ হওয়ার কারণে অল্প সময়ের ব্যবধানে এসব স্কুলভবন পরিত্যক্ত হয়ে পরে। এছাড়া নিম্মমানের নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে নির্মাণ করার কারনেও ভবন পরিত্যক্ত বা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। দুর্ঘটনা কবলিত বরগুনার তালতলীর ছোটবগী পিকে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনটি ২০০২ সালে নির্মাণ করেন তৎকালীন সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা মতিয়ার রহমানের ভাগ্নে আবদুল্লাহ আল মামুন। ২০০৪ সালে ভবনটি হস্তান্তর করেন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে। তবে নির্মাণের এক বছর মধ্যেই ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে শিক্ষা অফিসকে জানালেও তারা ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা না করে এখানেই পাঠদান চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয় শিক্ষা অফিস। ওই বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য জাকির হোসেন চুন্নু বলেন, ২০০২ সালে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির বরগুনা ২ আসনের সংসদ সদস্য মতিয়ার রহমানের ভাগ্নে সেতু এন্টার প্রাইজের স্বত্বাধিকারী আবদুল্লাহ আল মামুন টেন্ডার নিয়ে নিম্ন মানের কাঁচামাল দিয়ে ভবনটি নির্মাণ করেন। সে সময় তারা বাধা দিলেও তখন তার ক্ষমতার দাপটে কাজ বন্ধ করতে পারেনি তারা। আর এ কারণেই তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী মানসুরা বিদ্যালয়ে শিক্ষা অর্জন করতে এসে জীবন হারিয়েছে। বরগুনা সদর উপজেলার পূর্ব গুলিশাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পুর্ব ঢলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর বড় লবণ গোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফুলতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরকারী কলেজ সংলগ্ন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর কুমড়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ ১৫টি পরিত্যক্ত। এসব ভবণ ১৯৯০ সাল থেকে ২০০১ সালের মধ্যে নির্মাণ কর হয়। নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে স্কুল ভবণ নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেণ শিক্ষকরা। জানা যায়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী মন্ত্রনালয়ের (এলজিইডি) অর্থায়নে ১৯৯৪-২০০২ সালে মধ্যে এসব স্কুলভবন নিমার্ণ করা হয়। এসব ভবনের ছাদের পলেস্তার খসে পড়ে রড বেরিয়ে গেছে এবং বৃষ্টি হলে ছাদ চুয়ে পানি পরে। স্কুলভবনের কক্ষের ভিতরের দেয়ালে ফাটল ধরেছে। এছাড়া দেয়ালের পলেস্তার খসে পড়ছে। এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষক, ম্যানেজিং কমিটি ও শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা বলেন, বেশিরভাগ ভবন নির্মাণ হয়েছে ১৯৯৬ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে। তবে প্রভাবশালী ঠিকাদাররা নিম্নমানের মালামাল দিয়ে ভবন নির্মাণ করায় এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে এসব ভবন। তবে এসব বিষয়ে শিক্ষা অফিসকে জানালেও তারা ভবন নির্মাণের এক বছরের মাথায় ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করতে রাজি হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে এখানেই পাঠদান চালাচ্ছেন তারা। পুর্ব গুলিশাখালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবদুল রাজ্জাক বলেন, ২০০৭ সালে সিডরে আমাদের স্কুল ভবননটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বর্তমানে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছেন কর্তৃপক্ষ। বিকল্প কোন ভবন না থাকায় এক রকম বাধ্য হয়ে পরিত্যক্ত বিদ্যালয় ভবনে পাঠদান করাতে হয়। এই স্কুলে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১০৯ জন। ক্রোক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঝুকিুপূর্ণ হয়ে আছে এক বছর যাবত। এই বিদ্যালয়টির শিক্ষকও শিক্ষার্থীদের ঝড়ো বাতাসের সময় বিদ্যালয় ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া আছে। ঝড়ের সময় এই বিদ্যালয়টি কাঁপন ধরে বলে জানান শিক্ষার্থীরা। ক্রোক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবদুল আলীম বলেন, এই বিদ্যালয় টি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। যেকোনো সময় ভবনটি ধসে পড়ে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এছাড়া বাতাস শুরু হলে বাতাসে দোলতে থাকে। স্কুল ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কায় শিক্ষার্থীদের ছুটি দেয়া হয়। এছাড়া স্কুলের বেহাল দশার কারনে ছাত্র ছাত্রী উপস্থিতি কমে গেছে। পুর্ব ঢলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক মারিয়া মারজানা বলেন, এই বিদ্যালয়টি পরিত্যাক্ত হলেও বিকল্প কোনো ভবন না থাকায় এই ভবনেরই পাঠদান করাতে হয়। বিদ্যালয়ের ছাদ ও দেয়াল ফাটল ধরেছে। ভয়ের মধ্যে আমরা শিশুদের পাঠদান করাচ্ছি। বরগুনা সদর উপজেলা ভারপ্রাপ্ত উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেন সদরে ১৫টি পরিত্যক্ত এবং ৫০ টি ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়ে পাঠদান চলে। তবে এ বিষয়ে বরগুনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এম এম মিজানুর রহমান অসহায়ত্বের কথা স্বীকার করে দায় চাপালেন এলজিইডির উপর। তিনি বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভবন হস্তান্তর করার পর তারা ভবন রক্ষণাবেক্ষণ করেন। তবে নির্মাণে কেমন ধরনের কাঁচামাল ব্যবহার করলো বা নিম্ন মানের ভবন নির্মাণ হয়েছে কিনা এমনটা দেখার দায়িত্ব এলজিইডির। কারণ তাদের ইঞ্জিনিয়ার নেই। পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয় ভবনের তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। আমাদের নতুন বিদ্যালয় ভবন দরকার। আর ঝুকিপূর্ণ বিদ্যালয় ভবন যাতে পাঠদান করার যাবে না। বিকল্প ভবনে পাঠদান করানো হবে। বরগুনা জেলা প্রশাসক মো. কবীর মাহমুদ বলেন, ঝুকিপূর্ণ বিদ্যালয়ে পাঠদান না করানোর জন্য প্রত্যক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কে নির্দেশ দেয়া হয়েছে । তবে ঝুঁকিপূর্ণ এসব ভবন পরিদর্শন করেন দুদকের একটি দল। এসময় দুদকের পটুয়াখালী আঞ্চলিক অফিসের সহকারী পরিচালক মোজাম্মেল হোসেন বলেন, নড়ভড়ে এসব ভবন নির্মাণকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। উল্লেখ্য, শনিবার তালতলীর ছোটবগী পিকে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনের বীম ধ্বসে নিহত হয় মানসুরা নামে তৃতীয় শ্রেণীর এক শিক্ষার্থী। এর ঠিক দুইদিন পর মঙ্গলবার ফের বরগুনা সদরের আমতলারপাড়ের মধ্য বরগুনা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বীম ধসে পড়ে। তবে এ ঘটনায় কেউ আহত হয়নি।