তুমি হেঁটে চলে গেছ বহুদূর

পলান সরকারের মৃত্যুর খবর শুনে মলি রানী কুণ্ডু খুব কেঁদেছেন। তাঁর বাড়ি নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার গালিমপুর গ্রামে।

0 ৪৯

পলান সরকারের মৃত্যুর খবর শুনে মলি রানী কুণ্ডু খুব কেঁদেছেন। তাঁর বাড়ি নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার গালিমপুর গ্রামে। ২০১৭ সালে মলি রানী ও তাঁর ছেলে পিয়াল কুণ্ডু একসঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছিলেন। মা ও ছেলের একসঙ্গে পরীক্ষা দিয়ে পাসের খবর শুনে পলান সরকার গিয়ে হাজির হন মলি রানীর বাড়িতে। মা ও ছেলের জন্য তিনি উপহার হিসেবে দুইখানা বই নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের হাতে বই দুইখানা তুলে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আজ আমার বই পড়ার আন্দোলন সার্থক হলো।’

লেখাপড়ার অদম্য ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মলি রানী সুযোগ পাননি। তাঁকে অসময়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছিল। বাবার সংসারে লেখাপড়ার সুযোগ না পেলেও নিজের সংসারে এসে তিনি তাঁর অপূর্ণ ইচ্ছা পূরণ করেছেন। তাঁর পুরস্কার হিসেবে স্বয়ং পলান সরকারের হাত থেকে বই উপহার পেয়ে সেদিন তিনি আনন্দে কেঁদেছিলেন। তাই পলান সরকারের মৃত্যু তাঁকে দ্বিতীয়বার কাঁদিয়েছে। মলি রানী এবার এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছেন। আগামী ১ এপ্রিল তিনি এইচএসসি পরীক্ষা দেবেন। মুঠোফোনে মলি রানী বলেন, ‘পলান সরকার সেদিন আমাকে বলেছিলেন, “মা, তোমার আর পেছন ফিরে তাকানোর সময় নেই। তোমাকে এগিয়ে যেতে হবে।” সেই দিনই আমি ভেবে নিয়েছি, যেভাবেই হোক আমি পড়াশোনা শেষ করব। আমার বাড়িতে কোনো ছেলেমানুষ না থাকার কারণে আমি পলান সরকারকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে যেতে পারিনি। কান্নাকাটি করেছি। সারা দিন খুব মন খারাপ ছিল।’

পলান সরকার হেঁটে হেঁটে মানুষের বাড়িতে যেতেন। খুঁজে বের করতেন এ রকম মায়েদের। তাঁদের হাতে বই তুলে দিতেন। মাইনর (চতুর্থ শ্রেণি) পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় পলান সরকারের নিজের জুতা ছিল না। প্রতিবেশীর একটি রাবারের জুতা ধার নিয়ে পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলেন। অভিভাবক না থাকার কারণে মাইনর পাস করলেও পরে আর লেখাপড়া করা সম্ভব হয়নি। অদম্য ইচ্ছা থাকার পরও পড়া ছেড়ে দেওয়ার কী জ্বালা, শিশু বয়সেই তিনি খুব ভালো করে বুঝেছিলেন। তাই যে মায়েরা ছোটবেলায় পড়তে শিখেছিলেন, কিন্তু শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারেননি, তিনি আগে সেই মায়েদের খুঁজে বের করতেন। আর মাঝেমধ্যেই নেপোলিয়নের প্রসঙ্গ টেনে মায়েদের শিক্ষিত হওয়ার কথা বলতেন।