তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে নির্বাচনের সুপারিশ, দ্বিধাবিভক্ত পাহাড়ি নেতারা

১৩

স্টাফ রির্পোটার, ঢাকা

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভা থেকে আঞ্চলিক পরিষদসহ তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে নির্বাচনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এ নিয়ে দ্বিধাবিভক্তিতে পড়েছে পাহাড়ি নেতারা। অনেক নেতারাই বলছেন, পার্বত্য জেলায় উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নির্বাচন প্রয়োজন। আবার কেউ কেউ বলছেন, পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন ছাড়া নির্বাচনের সুপারিশ নীতিগতভাবে সমর্থন করা যায় না। পার্বত্য চট্টগ্রাম সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আইন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর আঞ্চলিক পরিষদ গঠিত হয়। ১৯৯৮ সালের ২৪ মে কার্যকর হওয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন অনুযায়ী, ২৫ সদস্য বিশিষ্ট নির্বাচিত পরিষদ থাকার কথা । কিন্তু পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমাকে চেয়ারম্যান করে পরিচালনা পরিষদ গঠন করা হয়। সেই থেকে গত ২১ বছরেও নির্বাচিত পরিষদ পায়নি আঞ্চলিক পরিষদ। অন্যদিকে, ১৯৮৯ সালে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে প্রথমবারের মতো নির্বাচন হয়েছিল। নির্বাচিত পরিষদের হাত ধরে পাঁচ বছর সেখানে উন্নয়ন কর্মকান্ড বাস্তবায়ন হয়েছিল। কিন্তু ১৯৯৩ সালে প্রথম নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ শেষে সরকার পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট অন্তর্বতীকালীন পরিষদ দিয়ে জেলা পরিষদের কার্যক্রম শুরু করে। সেই থেকে গত ২৬ বছর জেলা পরিষদগুলোতে আর কোনও নির্বাচন হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ বছরে জেলা পরিষদগুলো সরকারি দলের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন সেন্টারে পরিণত হয়েছে। জনগণের সেবা ও উন্নয়নের নামে পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, আত্মীয়করণ ও লুটপাটের সেন্টারে পরিণত হয়েছে। গত ২৬ বছরে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর চিত্র একই হলেও একটি পরিবর্তন হয়েছে। ২০১৫ সালের ২৫ মার্চ সরকার পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট অন্তর্র্বতীকালীন পরিষদ ভেঙে ১৫ সদস্য বিশিষ্ট অন্তর্র্বতীকালীন পরিষদে রূপান্তরিত করেছে। বর্তমানে সেই ১৫ সদস্য বিশিষ্ট সদস্য দিয়ে চলছে পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর বর্তমান কার্যক্রম। গত সোমবার (৮ এপ্রিল) পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় কমিটির আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে সুপারিশ করলে তা প্রতিক্রিয়া দেখা যায় পাহাড়ের নেতাদের মাঝে। খাগড়াছড়ি আসনের সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা বলেন, ‘প্রত্যেকটি জেলা পরিষদে একজন পাহাড়ি চেয়ারম্যানসহ ৩৪ সদস্য বিশিষ্ট নির্বাচিত পরিষদ থাকার কথা। কিন্তু নানা জটিলতায় গত আড়াই দশকেও নির্বাচন হয়নি। ফলে বিভিন্ন সরকারের আমলে মনোনীত সদস্যের মাধ্যমে অন্তর্র্বতীকালীন পরিষদ দিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছিল পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকার ইতোমধ্যে ২৮-৩২টি সরকারি বিভাগ জেলা পরিষদের হাতে ন্যাস্ত করেছে। কিন্তু অনির্বাচিত অন্তর্র্বতীকালীন পরিষদ থাকায় বিভাগগুলোতে পর্যাপ্ত তদারকি হয় না। যার ফলে মুখ থুবরে পড়ে উন্নয়ন কার্যক্রম। স্থবিরতা দূর করতে আমরা অনাষ্ঠুানিক আলোচনায় পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোতে নির্বাচনের সুপারিশ করেছি। প্রচলিত ভোটার তালিকা অনুযায়ী জেলা পরিষদের নির্বাচন হলে পর্যায়ক্রমে আঞ্চলিক পরিষদেও নির্বাচন হবে।’ যারা ভোটার হয়েছেন তারা পাহাড়ের উন্নয়ন, শান্তি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের জন্য নির্বাচিত পরিষদ নির্বাচন করবেন বলে মনে করেন তিনি। পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় কমিটি কীভাবে নির্বাচনের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করলেন তা বোধগম্য নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন ও ভূমিবিরোধ সমস্যার সমাধান এখনও হয়নি। এগুলোর সমাধান না করে নির্বাচনের জন্য সুপারিশ নীতিগতভাবে সমর্থন করা যায় না। পার্বত্য চুক্তির (শান্তি চুক্তির) ৯ ধারার শর্তানুযায়ী যদি জেলা পরিষদ নির্বাচনে পাহাড়ের স্থায়ী বাসিন্দারা ভোট দেন, তাহলে নির্বাচন নিয়ে আপত্তি নেই। আর জেলা পরিষদগুলোতে নির্বাচন হলে, আঞ্চলিক পরিষদেও নির্বাচন হবে।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দেশের প্রচলিত ভোটার তালিকা অনুযায়ী জেলা পরিষদগুলোর নির্বাচন হবার সুযোগ নেই, কারণ ২২ বছর আগে চুক্তি লিখিতভাবে করা হয়েছে।’ খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভুঁইয়া বলেন, ‘জেলা পরিষদগুলো সৃষ্টি করা হয়েছে নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ সামাজিক প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য। কিন্তু বাস্তবে এর চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। দুর্নীতি, আত্মীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, সদস্য এবং কর্মচারীরা শতশত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। এক কথায় জেলা পরিষদ সরকার দলীয় লোকদের পুনর্বাসন সেন্টারে পরিণত হয়েছে।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘পিসিজেএসএস নেতারা যদি প্রচলিত ভোটার তালিকায় এমপি হতে পারেন, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতে পারেন তাহলে জেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে তাদের আপত্তি গ্রহণযোগ্য নয়।’ খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সমীরণ দেওয়ান বলেন, ‘স্থানীয় সরকার পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত করতে জেলা পরিষদ, আঞ্চলিক পরিষদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকা দরকার। জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধি পাঠালে তাদের কাছে প্রত্যাশা যেমন পূরণ করতে পারে, তেমনি কৈফিয়তও চাইতে পারে।’ খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী বলেন, ‘আমি সবসময়ই নির্বাচনের পক্ষে। নির্বাচন হলে পার্বত্য জেলাগুলোর উন্নয়ন হবে। এতে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে।’তবে এই বিষয়ে একাধিক ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী দেশে প্রচলিত ভোটার তালিকা অনুযায়ী পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোতে ভোট হতে বাধা নেই।’ পার্বত্য চুক্তির ৯ ধারা মতে, পার্বত্য এলাকায় জায়গা জমি ও বাড়িঘর না থাকলে ভোটার হতে পারবে না বিধানটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এসব বিষয়ে সংবিধান সবসময় প্রাধান্য পাবে।’